প্রথমেই স্রোতের পাঠক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের জানাই নববর্ষের শুভেচ্ছা। প্রিয় পাঠক, দুই যুগ ধরে সম্পাদকীয় ডেস্কে বসে যখন পহেলা বৈশাখের রঙিন ছবিগুলো দেখি—চারদিকে লাল-সাদা শাড়ির ঢেউ, পাঞ্জাবির আভিজাত্য, মঙ্গল শোভাযাত্রার অসাম্প্রদায়িক স্পন্দন এবং রমনার বটমূলে ছায়ানটের সেই চিরচেনা রবীন্দ্রসংগীতের সুর।
তখন মনে হয়, নতুনকে বরণ করে নেওয়ার এই যে অদম্য আনন্দ, তা কি কেবল আমাদের একার?
বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। পুরোনো জরা, গ্লানি আর না-পাওয়ার বেদনাকে কালবৈশাখীর ঝড়ে উড়িয়ে দিয়ে নতুন এক ভোরের স্বপ্ন দেখার দিন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, মানুষের এই শিকড়ের টান আর নতুনের আবাহন কেবল বাংলার মাটিতেই সীমাবদ্ধ নেই। পৃথিবীর নানা প্রান্তে, নানা সংস্কৃতিতে ঠিক পহেলা বৈশাখের মতোই প্রকৃতির পটপরিবর্তনকে কেন্দ্র করে পালিত হয় চোখধাঁধানো সব উৎসব।
চলুন তবে, আমাদের চেনা বৈশাখের চশমা দিয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এমন কয়েকটি বর্ণিল নববর্ষ বা বসন্ত উৎসবের দিকে তাকাই এবং খুঁজে বের করার চেষ্টা করি, এই সব বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্যে দিনশেষে ‘সেরা’ কোনটি?
বিশ্বজুড়ে নতুনের জয়গান:
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসন্তের আগমন বা ফসল কাটার সময়কে কেন্দ্র করে যে উৎসবগুলো হয়, তার সঙ্গে আমাদের পহেলা বৈশাখের আত্মিক এক দারুণ মিল রয়েছে। চলুন দেখে নিই বিশ্বজুড়ে এর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আয়োজন—
১. থাইল্যান্ডের 'সংক্রান':
আমাদের পহেলা বৈশাখ আর থাইল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ ‘সংক্রান’ প্রায় একই সময়ে (১৩-১৫ এপ্রিল) পালিত হয়। আমাদের উৎসব যেমন রঙের, সংক্রান হলো জলের। থাই ভাষায় সংক্রান মানে হলো ‘পরিবর্তন’ বা ‘এগিয়ে যাওয়া’।
এই উৎসবে থাইরা একে অপরের গায়ে সুগন্ধি মেশানো জল ছিটিয়ে পুরোনো বছরের পাপ ও দুর্ভাগ্য ধুয়েমুছে ফেলে। পুরো দেশ যেন এক বিশাল জলখেলার মাঠে পরিণত হয়। পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দ করা, মন্দিরে যাওয়া আর একে অপরের মঙ্গল কামনার এই রূপ আমাদের বৈশাখের আবহকেই মনে করিয়ে দেয়।
২. ইরানের 'নওরোজ':
ফার্সি শব্দ ‘নওরোজ’-এর অর্থ হলো ‘নতুন দিন’। এটি মূলত ইরানি বা ফার্সি নববর্ষ, যা বসন্তের বিষুব ক্ষণে (সাধারণত ২০ বা ২১ মার্চ) পালিত হয়। তিন হাজার বছরের বেশি পুরোনো এই উৎসবের মূল আকর্ষণ হলো ‘হাফ্ত-সিন’ (Haft-seen) নামের একটি বিশেষ টেবিল সাজানো, যেখানে 'স' (S) অক্ষর দিয়ে শুরু হওয়া সাতটি প্রতীকী উপাদান রাখা হয় (যেমন—আপেল, রসুন, গম ইত্যাদি), যা স্বাস্থ্য, সম্পদ ও ভালোবাসার প্রতীক।
আমাদের চৈত্রসংক্রান্তির মতোই তারা আগুনের ওপর দিয়ে লাফিয়ে পুরোনো বছরের গ্লানি পোড়ানোর উৎসব ‘চাহারশানবে সুরি’ পালন করে।
৩. চীনের 'স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল':
জানুয়ারির শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে পালিত হওয়া এই উৎসব বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানব-পরিযানের সাক্ষী। আমাদের বৈশাখে যেমন লাল-সাদার আধিপত্য, চীনা নববর্ষে তেমনি সবকিছু সেজে ওঠে গাঢ় লাল রঙে।
লাল লণ্ঠন, ড্রাগন নাচ আর পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে পাওয়া লাল খামে মোড়ানো উপহার (হংবাও)—সব মিলিয়ে এ এক দারুণ পারিবারিক ও সামাজিক মিলনমেলা। অশুভ আত্মাকে তাড়াতে তারা যে আতশবাজির উৎসব করে, তা মূলত মঙ্গলেরই প্রার্থনা।
৪. ভারতের 'বৈশাখী' এবং 'বিহু':
আমাদের একেবারে পাশের দেশ ভারতের পাঞ্জাবে পালিত হয় ‘বৈশাখী’, যা মূলত তাদের ফসল তোলার উৎসব এবং শিখ সম্প্রদায়ের নববর্ষ। ঢোলের তালে ভাঙড়া নাচ আর কৃষকের হাসিতে এই দিনটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। অন্যদিকে আসামে পালিত হয় ‘রঙালী বিহু’, যা বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে।
গানের সুর আর বিহু নাচের ছন্দে আসামের আকাশ-বাতাস মুখরিত থাকে, ঠিক যেমনটা থাকে আমাদের রমনা কিংবা চারুকলা প্রাঙ্গণ।
কোনটি সেরা?
এবার আসি সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নে; থাইল্যান্ডের উদ্দাম সংক্রান, ইরানের ঐতিহ্যবাহী নওরোজ, চীনের বর্ণিল স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল নাকি আমাদের প্রাণের পহেলা বৈশাখ—এর মধ্যে সেরা কোনটি?
একজন মানুষ এবং একজন সংবাদকর্মী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিকে যখন আমি দেখি, তখন বুঝতে পারি, আনন্দ পরিমাপ করার কোনো যন্ত্র আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। নওরোজের আভিজাত্য, সংক্রানের বাঁধভাঙা উল্লাস কিংবা চীনা নববর্ষের বিশালত্ব—প্রতিটিরই রয়েছে নিজস্ব জাদুকরী সৌন্দর্য।
তবে যদি আমাকে ‘সেরা’ নির্বাচন করতেই হয়, তবে আমি নির্দ্বিধায় আমাদের পহেলা বৈশাখ এবং এর মঙ্গল শোভাযাত্রাকেই মুকুট পরাব।
কেন? এর পেছনে অন্ধ জাতীয়তাবাদ নেই, আছে গভীর এক দর্শন। বিশ্বের বেশিরভাগ নববর্ষই আবর্তিত হয় কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, পুরাণ বা কেবলই ফসল কাটার আনন্দকে কেন্দ্র করে।
কিন্তু পহেলা বৈশাখ এবং এর মঙ্গল শোভাযাত্রা হলো পৃথিবীর বুকে অন্যতম বিরল এক উৎসব, যা আক্ষরিক অর্থেই সর্বজনীন এবং সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক।
মঙ্গল শোভাযাত্রায় যখন বাঘ, পেঁচা বা ঘোড়ার বিশাল সব ভাস্কর্য নিয়ে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে লাখো মানুষ একসঙ্গে হাঁটে, তখন তারা কেবল আনন্দ করে না; তারা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী প্রতিবাদ জানায়।
১৯৮৯ সালে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যে মঙ্গল শোভাযাত্রার শুরু, তা আজ জাতিসংঘের ইউনেস্কো (UNESCO) কর্তৃক ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’-এর স্বীকৃতি পেয়েছে।
আমাদের বৈশাখ কেবল নতুন জামা আর পান্তা-ইলিশের নয়, আমাদের বৈশাখ হলো মাথা নত না করার, অশুভকে রুখে দিয়ে মানুষের জয়গান গাওয়ার উৎসব।
উৎসব মূলত মানুষের আত্মার খোরাক। ভৌগোলিক সীমানা আর ভাষার ভিন্নতা থাকলেও, নতুনের প্রতি মানুষের এই যে চিরন্তন প্রেম, এটাই মানবজাতির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। থাইল্যান্ডের রাস্তায় ছিটানো জল, ইরানের টেবিলে সাজানো আপেল আর বাংলার রাজপথে গাওয়া 'এসো হে বৈশাখ'—এই সব সুর আসলে এক মোহনায় এসে মিলেছে। সেই মোহনার নাম—আশা।