শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু। এরপর স্থানীয় রাজনীতি, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা, রাজপথের আন্দোলন, গ্রেপ্তার ও কারাবাস, বাংলাদেশের রাজনীতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পথচলা একাধিক বাঁকবদলে ভরা। প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেমন ক্ষমতার কাছাকাছি গেছেন, তেমনি দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন ক্ষমতার বাইরে থেকেও। ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয় এবং নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে এসেছে আরেকটি বড় প্রত্যাবর্তন।
ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে কয়েকটি সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।
তবে ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনের অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ও সাংগঠনিক ভূমিকার ভিত তৈরি করে।
স্থানীয় রাজনীতি থেকে বিএনপিতে
শিক্ষকতার পাশাপাশি ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয়তা বাড়তে থাকে। ১৯৮৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরে সরকারি চাকরি ছেড়ে পূর্ণকালীন রাজনীতিতে আসেন এবং নব্বইয়ের দশকে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
এ সময় বিএনপির রাজনীতিতে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেন ফখরুল। দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পাওয়ার পাশাপাশি তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তিও শক্ত করেন।
২০০১: বড় রাজনৈতিক উত্থান
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় বাঁক আসে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এরপর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারে প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
অর্থাৎ স্থানীয় রাজনীতির মাঠ থেকে সরাসরি জাতীয় সংসদ এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে উঠে আসেন তিনি। তবে ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দৃশ্যপটও বদলে যায়।
ক্ষমতার বাইরে, দলের ভেতরে উত্থান
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি বিরোধী দলে চলে গেলে ফখরুল দলের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। ২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান তিনি। একই সঙ্গে বিরোধী দলের মুখপাত্র হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি আরও দৃঢ় হয়।
২০১১ সালে বিএনপির মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ফখরুলকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রায় পাঁচ বছর এই দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন তিনি।
এটাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্থানগুলোর একটি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পর বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফখরুল হয়ে ওঠেন অন্যতম প্রধান মুখ।
দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি ও চাপ
২০১৪ ও ২০১৮ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির আন্দোলন ও নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন ফখরুল। ২০১৮ সালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর বিএনপির হয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংলাপ ও কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।
তবে দীর্ঘ বিরোধী সময়ে বিএনপি নানা রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে। দলীয় নেতৃত্বের বড় অংশ মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে চাপে ছিল। সেই সময়ে ফখরুলকে দলটির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মুখ হিসেবে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন, কর্মসূচি ও আন্দোলনে দেখা যায়।
২০২৩: রাজপথ থেকে কারাগারে
ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম কঠিন অধ্যায় আসে ২০২৩ সালের অক্টোবরে। ২৮ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও সহিংসতার পর ২৯ অক্টোবর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নাশকতাসহ বিভিন্ন মামলার কথা উঠে আসে।
প্রায় সাড়ে তিন মাস কারাবন্দি থাকার পর ২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জামিনে মুক্তি পান তিনি। দীর্ঘ কারাবাস তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ও কঠিন সময়গুলোর একটি হয়ে থাকে।
২০২৪-এর রাজনৈতিক পালাবদল
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির রাজনীতিতেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। ফখরুল আবারও দলের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মুখ হিসেবে সক্রিয় হন। দীর্ঘদিন বিরোধী অবস্থানে থাকা বিএনপি এরপর নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয় এবং ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বড় ব্যবধানে জয় পান ফখরুল। নির্বাচন কমিশনের ফল অনুযায়ী তিনি ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট পান; তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন পান ১ লাখ ৪১ হাজার ১৭ ভোট।
দীর্ঘ বিরতির পর সংসদে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আবারও মন্ত্রিসভায়
সংসদে ফেরার পর ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নতুন সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সরকারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তালিকাতেও তাঁর এই দায়িত্বের তথ্য রয়েছে।
অর্থাৎ ২০০১ সালে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যে মন্ত্রিসভায় তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল, প্রায় ২৫ বছর পর তিনি আবারও মন্ত্রিসভায় ফিরলেন, এবার পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে।
ফখরুলের রাজনৈতিক পরিচয়ের দ্বৈততা
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনকে শুধু ক্ষমতা ও বিরোধিতার পালাবদল দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তাঁর ক্যারিয়ারে একদিকে রয়েছে ২০০১ সালের মন্ত্রীত্ব, অন্যদিকে দীর্ঘ সময়ের বিরোধী রাজনীতি। রয়েছে দলের মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ দায়িত্ব পালন, রাজপথের আন্দোলন, গ্রেপ্তার ও কারাবাস; আবার রয়েছে ২০২৬ সালে নির্বাচনে জয় এবং মন্ত্রিসভায় প্রত্যাবর্তন।
বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি দলটির রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যার পাশাপাশি বিভিন্ন সময় সংলাপ ও সমঝোতার আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। একই সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। ফলে ফখরুলের রাজনৈতিক মূল্যায়ন করতে গেলে তাঁর সাফল্যের পাশাপাশি দলীয় রাজনীতির ব্যর্থতা, আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘ বিরোধী সময়ের চ্যালেঞ্জগুলোও বিবেচনায় নিতে হয়।
সামনে নতুন পরীক্ষা
২০২৬ সালে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। এবার তাঁর সামনে বিরোধী দলের আন্দোলন পরিচালনার পরিবর্তে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি তাঁকে দলের মহাসচিবের দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে এক অনুষ্ঠানে ফখরুল বলেন, সরকার গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে কাজ করছে।
তাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের বর্তমান অধ্যায়টি আগের সব অধ্যায়ের চেয়ে আলাদা। একসময় যে নেতা সরকারের সমালোচনা করতেন, আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করতেন এবং কারাগারে যেতেন, এখন তাকেই সরকার পরিচালনার অংশ হিসেবে সাফল্যের হিসাব দিতে হচ্ছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় নেতৃত্ব, প্রতিমন্ত্রী থেকে মহাসচিব, বিরোধী রাজনীতির দীর্ঘ পথ, কারাবাস এবং শেষ পর্যন্ত আবার মন্ত্রিসভায় প্রত্যাবর্তন, ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো বিরোধী দলের রাজনীতিতে অর্জিত দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতায় কতটা কাজে লাগাতে পারেন।