বিশ্বজুড়ে বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যের সুরক্ষার আহ্বান জানিয়ে আজ রোববার (৯ আগস্ট) পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছর ৯ আগস্ট দিবসটি পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ‘Honouring Indigenous Midwives: Safeguarding Life and Well-being’, অর্থাৎ ‘আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান: জীবন ও কল্যাণ সুরক্ষা’।
১৯৮২ সালের ৯ আগস্ট জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক উপকমিশনের অধীনে আদিবাসী জনগোষ্ঠী নিয়ে গঠিত ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই দিনটির স্মরণে ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৯ আগস্টকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। পরের বছর, ১৯৯৫ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, বিশ্বের ৯০টি দেশে ৪৭ কোটি ৬০ লাখের বেশি আদিবাসী মানুষ বসবাস করেন। তারা বিশ্ব জনসংখ্যার ৬ শতাংশেরও কম হলেও বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের অন্তত ১৫ শতাংশই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য। বিশ্বের প্রায় ৭ হাজার ভাষার বড় একটি অংশ আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে টিকে আছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ হাজার পৃথক আদিবাসী সংস্কৃতির অস্তিত্ব রয়েছে।
তবে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও জ্ঞানভাণ্ডারের অধিকারী এসব জনগোষ্ঠী এখনো নানা ধরনের বৈষম্য ও বঞ্চনার মুখোমুখি। ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলো তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, ঐতিহাসিকভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, পরিচয় ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারের ওপর বিভিন্নভাবে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে।
এবারের দিবসের মূল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আদিবাসী ধাত্রীদের ভূমিকা ও ঐতিহ্যগত জ্ঞানকে স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, অনেক আদিবাসী সমাজে ধাত্রীরা শুধু সন্তান প্রসবের সময় সহায়তা করেন না; তারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিক জ্ঞানও বহন করে চলেন। কিন্তু বিভিন্ন দেশে এসব ঐতিহ্যগত স্বাস্থ্যব্যবস্থা বৈষম্য, সামাজিক অবমূল্যায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার মুখে রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সমতলের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। এসব জনগোষ্ঠীর জীবনধারা প্রকৃতি ও ভূমির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সাম্প্রতিক গবেষণায় বাংলাদেশের জাতিগত ও আদিবাসী ভাষাগুলোর অবস্থাও উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ৪০টি সংখ্যালঘু ভাষা রয়েছে এবং এর মধ্যে অন্তত ১৪টি ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ভাষার বড় অংশই মৌখিক ঐতিহ্যনির্ভর হওয়ায় সংরক্ষণ ও ডিজিটাল নথিভুক্তির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
এদিকে বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার ও আদিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি ও অধিকারসংক্রান্ত বিরোধ, সহিংসতা এবং দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি বিশ্বের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা ও স্বতন্ত্র পরিচয়ের প্রতি সম্মান জানানোর দিন। একই সঙ্গে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অধিকার রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানায় দিবসটি।
জাতিসংঘের মতে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জ্ঞান শুধু তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ নয়, পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই তাদের বাদ দিয়ে নয়, বরং তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়েই টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে জাতিসংঘ।