রমনার বটমূল থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ—সবখানেই নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন আয়োজকেরা। আবহমান বাংলার সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতেই এবারের উদযাপনে যোগ করা হয়েছে ভিন্নমাত্রা।
রমনার বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী আয়োজন
প্রতিবারের মতো এবারও বাংলা নববর্ষের ভোরে রমনার বটমূলে শুরু হবে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, শুদ্ধ সংগীতের পাশাপাশি থাকছে লোকগানের বিশেষ পরিবেশনা। ইতিমধ্যে মঞ্চ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়েছে কঠোর ব্যবস্থা।
ইউনেস্কো স্বীকৃত মঙ্গল শোভাযাত্রা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। ইউনেস্কোর স্বীকৃত এই শোভাযাত্রার এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সমসাময়িক প্রেক্ষাপট বিবেচনায়। বিশালাকৃতির মুখোশ, লোকজ কাঠামো ও সরাচিত্র তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। পহেলা বৈশাখ সকাল ৯টায় চারুকলা থেকে শোভাযাত্রা বের হবে।
সারাদেশে উদযাপনের পরিকল্পনা
নববর্ষ উদযাপন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। জেলা শহরগুলোতে বসছে বৈশাখী মেলা। কুটিরশিল্প, মৃৎশিল্প ও দেশীয় খাবারের সমারোহে এসব মেলা জমে উঠবে কয়েক দিনের জন্য।
নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা
বিপুল জনসমাগমকে সামনে রেখে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা। রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোন নজরদারি। নির্দিষ্ট প্রবেশপথ ও তল্লাশি চৌকি রাখা হয়েছে। খোলা স্থানের অনুষ্ঠান সন্ধ্যার মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে।
অর্থনীতিতে বৈশাখের প্রভাব
নববর্ষ ঘিরে বাজারেও দেখা যাচ্ছে চাঙাভাব। পোশাক, ইলেকট্রনিকস ও খাদ্যপণ্যের দোকানে চলছে বিশেষ ছাড়। দেশি বুটিক হাউজগুলোতে বৈশাখী পোশাকের চাহিদা তুঙ্গে। ব্যবসায়ীদের মতে, এই সময়ের বেচাকেনা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ঐতিহ্যে হালখাতা ও গ্রামীণ আয়োজন
পুরান ঢাকা থেকে শুরু করে মফস্বলের বাজারগুলোতে হালখাতা খোলার প্রস্তুতি চলছে। পুরোনো বছরের হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতা খোলার এই রীতি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে বলী খেলা, ঘোড়দৌড় ও লাঠিখেলার আয়োজনও চূড়ান্ত।
ডিজিটাল মাধ্যমে বৈশাখ
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ জানিয়েছে, এবারের নববর্ষের অনুষ্ঠানমালা সরাসরি সম্প্রচারের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকবে বিশেষ প্রচারণা। প্রবাসীদের যুক্ত করতে আয়োজন করা হচ্ছে ওয়েবিনার ও ভার্চ্যুয়াল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
পরিবেশবান্ধব উদযাপনের উদ্যোগ
এবারের উদযাপনে পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে মাটির পাত্র ও পাটের ব্যাগ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত উৎসব নিশ্চিত করতে চলছে সচেতনতামূলক কার্যক্রম।
সব মিলিয়ে, বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বরণে এই ব্যাপক প্রস্তুতি আবারও মনে করিয়ে দেয়—বাঙালির সংস্কৃতির শেকড় গভীর। পহেলা বৈশাখের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন আশা আর স্বপ্ন নিয়ে পথচলা শুরু করবে পুরো জাতি।