আজ ২৯ এপ্রিল। বাংলাদেশের উপকূলীয় ইতিহাসের এক বিষাদময় ও রক্তক্ষরণী দিন। আজ থেকে ঠিক ৩৫ বছর আগে, ১৯৯১ সালের এই দিনে এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও ২০ ফুট উচ্চতার দানবীয় জলোচ্ছ্বাস মুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের সাজানো জনপদ। সাড়ে তিন দশক পেরিয়ে গেলেও কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও ঈদগাঁওর লোনা জলে আজও মিশে আছে স্বজন হারানোর দীর্ঘশ্বাস।
১৯৯১ সালের সেই কালরাতে প্রকৃতি যখন রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছিল, তখন উপকূলবাসী কল্পনাও করতে পারেনি কী বিভীষিকা তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। বাতাসের প্রচণ্ড গতিবেগ আর পাহাড় সমান ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে গিয়েছিল জনপদ। আজ সেই ধ্বংসযজ্ঞের ৩৫ বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া ও ঈদগাঁওর বিস্তীর্ণ জনপদে সেই ক্ষত আজও দগদগে। প্রতি বছর ২৯ এপ্রিল এলেই আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে ওঠে হারানো স্বজনদের আহাজারিতে।
সেদিনের সেই নারকীয় তাণ্ডবের সাক্ষী ঈদগাঁও উপজেলার ইসলামাবাদ টেকপাড়া গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী জহির আহমদ। ৩৫ বছর আগের সেই রাত তার জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে মা, স্ত্রী আর কলিজার টুকরো সন্তানকে। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জহির আহমদ বলেন, “জলোচ্ছ্বাস আমার সাজানো সংসারটাকে এক নিমিষেই শ্মশান বানিয়ে দিয়েছিল। ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে যাওয়া প্রিয়জনদের মৃতদেহটা পর্যন্ত দেখার সুযোগ দেয়নি খোদা। আজ ৩৫ বছর পরও রাতের বেলা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ শুনলে বুকটা কেঁপে ওঠে।”
জহিরের মতো এমন হাজারো মানুষ আজও সাগরের গর্জনে আঁতকে ওঠেন। উপকূলীয় জনপদে এমন কোনো পরিবার নেই যারা সেদিন অন্তত একজন স্বজন হারায়নি। লাশের গন্ধে তখন ভারি হয়ে উঠেছিল বাতাস, আর লোনা পানি হয়ে উঠেছিল কবরের চাদর।
পঁয়ত্রিশ বছর আগে উপকূলীয় এলাকায় পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার বা বেড়িবাঁধ ছিল না। আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং সঠিক সময়ে সতর্কবার্তা না পৌঁছানো ছিল সেই বিপুল প্রাণহানির অন্যতম কারণ। তবে বর্তমান সময়ে আবহাওয়া দপ্তরের সক্ষমতা এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের ফলে ক্ষয়ক্ষতির হার কমেছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতিনিয়ত বাড়ছে সমুদ্রের উচ্চতা, যা কুতুবদিয়ার মতো দ্বীপগুলোকে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলছে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু একটি দিন স্মরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, স্থায়ীভাবে উপকূল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং বনায়ন জোরদার করা প্রয়োজন। নয়তো প্রকৃতির সামান্য রোষানলে আবারো বড় ধরণের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে এই জনপদ।