গরম পুরোপুরি জমে ওঠার আগেই দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অস্বস্তিকর দিকে মোড় নিয়েছে। জ্বালানি সংকটের প্রভাব এবার সরাসরি গিয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে, বিশেষ করে গ্রামে, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎহীনতা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা।
শহরে যেখানে কয়েক ঘণ্টার লোডশেডিং সামলাতে হচ্ছে, সেখানে গ্রামীণ এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এতে জীবনযাত্রা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি চাপ বাড়ছে কৃষি, মৎস্য, পোল্ট্রি ও শিল্প খাতেও।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, প্রতিদিন চাহিদার তুলনায় প্রায় ২ থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে। এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে ভারতের আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বাঁশখালীর একটি ইউনিট বন্ধ থাকা, যা সরবরাহে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
গ্রামীণ এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন। কোথাও কোথাও চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। কক্সবাজারের টেকনাফসহ বিভিন্ন অঞ্চলে টানা ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ না থাকার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই চিত্র শেরপুর, ময়মনসিংহসহ দেশের নানা জেলায়।
সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন কৃষকরা। বোরো মৌসুমে সেচ দিতে না পারায় ফসল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেকেই ধার করে চাষ করেছেন, কিন্তু পানি না পেলে সেই বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ছে।
কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগারগুলোতেও দেখা দিয়েছে নতুন সমস্যা। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, ফলে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ। এতে সংরক্ষিত আলু ও বীজের মান নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলগুলোয় একসঙ্গে দুই ধরনের সংকট, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিজেলের ঘাটতির কারণে জেনারেটর চালানোও কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা রপ্তানি সময়সূচিকেও অনিশ্চিত করে তুলছে।
পোল্ট্রি ও মৎস্য খাতও এর বাইরে নয়। অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় খামারগুলোতে প্রাণী বাঁচিয়ে রাখাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাছের উৎপাদনেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।
শিক্ষার্থীরাও ভোগান্তিতে। বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছেন না, কারণ বিদ্যুতের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। ফলে বড় ধরনের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনা থাকলেও পুরোপুরি স্বস্তি ফেরার মতো অবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। তখনও প্রায় ১২০০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকার আশঙ্কা রয়েছে।