নতুন পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা, বেসরকারি খাতে এখনো নেই কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো
সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। অর্থাৎ গ্রেডভেদে প্রারম্ভিক মূল বেতন বাড়ছে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে।
কিন্তু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির এই খবরের মধ্যেই বড় একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে, বেসরকারি চাকরিজীবীদের কী হবে?
কারণ দেশের কর্মজীবী মানুষের বড় একটি অংশ সরকারি চাকরির বাইরে। তাঁদের বেতন কোনো জাতীয় পে-স্কেলের অধীনে নির্ধারিত হয় না। ফলে সরকারি কর্মীদের বেতন যখন এক লাফে দ্বিগুণের কাছাকাছি যাচ্ছে, তখন একই বাজারে কাজ করা বেসরকারি কর্মীদের আয় কতটা বাড়বে, সেটি এখন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়েছে, সিদ্ধান্ত হয়নি
নতুন জাতীয় বেতনস্কেল অনুমোদনের দিনই বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, বেসরকারি শিল্প ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে কত শতাংশ বেতন বাড়বে বা কবে থেকে বাড়বে, এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি।
এখানেই সরকারি ও বেসরকারি চাকরির বেতন কাঠামোর মৌলিক পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। সরকারি কর্মীদের জন্য রাষ্ট্র একটি অভিন্ন জাতীয় বেতন কাঠামো নির্ধারণ করে। কিন্তু বেসরকারি খাতে প্রতিষ্ঠানের ধরন, শিল্প, পদ, দক্ষতা, ব্যবসার সক্ষমতা ও শ্রমবাজারের ওপর ভিত্তি করে বেতন নির্ধারিত হয়।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর ৫ থেকে ৭ শতাংশ হারে বেতন বাড়ায়। কিন্তু নতুন সরকারি পে-স্কেলে যেখানে নিম্ন গ্রেডে ১০০ শতাংশের বেশি প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেখানে ৫ থেকে ৭ শতাংশ বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বেসরকারি কর্মীদের প্রত্যাশার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো বড় বাস্তবতা
বেতন বাড়ানোর আলোচনা শুধু সরকারি-বেসরকারি বৈষম্যের বিষয় নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬-এ দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে মানুষের আয় বাড়লেও বাজারদরের চাপ এখনো উল্লেখযোগ্য।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, নিম্ন আয়ের কর্মীদের মজুরি দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। এতে তাঁদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
এ কারণে বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য শুধু বেতন বৃদ্ধির হার নয়, বেতন বৃদ্ধির পর প্রকৃত আয় কতটা বাড়ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মজুরি বাড়ছে, কিন্তু কতটা?
বাংলাদেশের জাতীয় মজুরি হার সূচকও একই ধরনের একটি চিত্র দেখাচ্ছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাতীয় পর্যায়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে মজুরি বাড়লেও তা মূল্যস্ফীতির তুলনায় খুব বেশি ব্যবধান তৈরি করছে না।
ঢাকা বিভাগে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো ছিল। জুলাইয়ে এখানে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ, যেখানে শহরাঞ্চলের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ ঢাকায় মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে সামান্য বেশি ছিল।
তবে এই পরিসংখ্যানকে সব বেসরকারি চাকরিজীবীর বেতন বৃদ্ধির সরাসরি হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ মজুরি হার সূচকে বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের মজুরি পরিবর্তন ধরা হয়; অফিস, ব্যাংক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান বা নির্দিষ্ট পেশার প্রত্যেক কর্মীর বেতন এখানে আলাদাভাবে প্রতিফলিত হয় না।
সব বেসরকারি কর্মীর জন্য এক বেতন নয়
বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, বেসরকারি খাতের জন্য একটি অভিন্ন জাতীয় ন্যূনতম বেতন নেই।
শ্রম আইন অনুযায়ী বিভিন্ন শিল্পে নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড কাজ করে। কোনো শিল্পের জন্য সরকারিভাবে নির্ধারিত নিম্নতম মজুরি থাকলে সেটি সংশ্লিষ্ট মালিকের জন্য বাধ্যতামূলক।
এ কারণেই তৈরি পোশাক, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, চা, ফার্মাসিউটিক্যালস, পোলট্রি কিংবা অন্যান্য শিল্পে মজুরির কাঠামো এক নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও বিভিন্ন শিল্পের জন্য নতুন মজুরি নির্ধারণের কাজ করেছে নিম্নতম মজুরি বোর্ড।
তৈরি পোশাক খাতের উদাহরণটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতে সর্বশেষ নির্ধারিত নিম্নতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা এবং বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির হার ৯ শতাংশ। তবে এটি পুরো বেসরকারি খাতের জন্য প্রযোজ্য কোনো জাতীয় বেতন কাঠামো নয়।
সরকারি বেতন বাড়লে বেসরকারি খাতে চাপ বাড়বে?
অর্থনীতিবিদ ও শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের আলোচনায় এখন যে বিষয়টি সামনে আসছে, তা হলো বেতন কাঠামোর প্রতিযোগিতা।
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বেতন ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাড়লে দক্ষ কর্মীদের আকৃষ্ট করতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিজেদের বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।
বিশেষ করে ব্যাংক, টেলিকম, প্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যালস, উৎপাদন, এনজিও ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানে দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখার জন্য বাজারভিত্তিক বেতন গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি চাকরির আর্থিক সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে কিছু ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতামূলক বেতন, বোনাস বা অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে উল্টো দিকও আছে। ব্যবসা যদি দুর্বল থাকে, উৎপাদন খরচ বাড়ে কিংবা প্রতিষ্ঠানের আয় কমে যায়, তাহলে সব কোম্পানির পক্ষে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোথায়?
এখানে মূল প্রশ্ন হলো, সরকারি পে-স্কেলের আদলে বেসরকারি খাতেও কি কোনো অভিন্ন কাঠামো করা সম্ভব?
বাস্তবে এটি সহজ নয়। কারণ একটি ছোট ব্যবসা, একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, একটি পোশাক কারখানা ও একটি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা এক নয়। সবার জন্য একই বেতন কাঠামো নির্ধারণ করলে অনেক প্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে কোনো কাঠামো না থাকলে কর্মীদের মধ্যে বৈষম্য, কম বেতন, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে আয়ের অসামঞ্জস্য এবং দক্ষ কর্মীদের চাকরি পরিবর্তনের প্রবণতা বাড়তে পারে।
তাই বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে, সব প্রতিষ্ঠানের জন্য এক বেতন নয়, বরং খাতভিত্তিক ন্যূনতম মজুরি, নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনা এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন পুনর্নির্ধারণের একটি কার্যকর ব্যবস্থা।
সরকারি কর্মীরা পেলেন নতুন কাঠামো, বেসরকারিদের অপেক্ষা
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং প্রায় সোয়া ৯ লাখ পেনশনভোগী সুবিধা পাবেন বলে সরকারি তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন কাঠামোর মূল বেতন ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু দেশের বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এখনো তেমন কোনো সামগ্রিক সিদ্ধান্ত নেই।
ফলে সরকারি কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির পর নতুন করে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটি কেবল কার বেতন কত বাড়ল, এই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের শ্রমবাজার, দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা।