বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর আধুনিকায়নের উদ্যোগ এখন নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হওয়ার পর নতুন করে আরও বড় সংখ্যায় বোয়িং কেনার প্রতিশ্রুতির কথা সামনে এসেছে। মার্কিন পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এই নতুন ক্রয়াদেশের মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের বিমান বহর আধুনিক করার প্রয়োজন থেকেই কি এই বড় সিদ্ধান্ত, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের হিসাবও এর পেছনে কাজ করছে?
১৪ থেকে ২৫, এরপর আরও?
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা অনেক দিনের। পুরোনো উড়োজাহাজের বয়স, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক রুটে প্রতিযোগিতা বাড়ায় নতুন বিমান কেনার প্রয়োজন দেখা দেয়।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার সময় বাংলাদেশ ১৪টির বদলে ২৫টি বোয়িং কেনার পরিকল্পনা সামনে আনে। পরে চলতি বছরের এপ্রিলে ১৪টি বিমানের জন্য আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়।
এই চুক্তির আওতায় আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স কেনার কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম উড়োজাহাজটি ২০৩১ সালের দিকে বাংলাদেশে আসতে পারে।
তবে এখন নতুন প্রশ্ন হলো ১৪টি বিমানের পর সংখ্যা কত হবে?
মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গর জানিয়েছেন, বাংলাদেশ নতুন সমঝোতার আওতায় আগের প্রতিশ্রুতির চেয়েও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বোয়িং কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। তবে ঠিক কতটি বিমান কেনা হবে, কোন মডেলের হবে এবং মোট মূল্য কত, এসব এখনো স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের অনুরোধ কতটা প্রভাব ফেলেছে?
বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাট বলেছেন, ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বোয়িং কেনার অনুরোধ করেছিলেন। এরপরই বিমান কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে তিনি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, কোনো চাপের কারণে নয়, বাংলাদেশের প্রয়োজন বিবেচনা করেই বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দুই বক্তব্যে তৈরি হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন।
সিদ্ধান্ত যদি পুরোপুরি বাংলাদেশের প্রয়োজনের ভিত্তিতে হয়, তাহলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুরোধের বিষয়টি কেন সামনে আসছে? আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক আলোচনার সময়ই যদি বোয়িং কেনার পরিমাণ বাড়ে, তাহলে বাণিজ্য সমঝোতার প্রভাব কতটা ছিল?
যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থও কি আছে?
বোয়িং কেনার বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের বিমান খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্বার্থও রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি কমানোর ওপর জোর দিয়ে আসছে। বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনাতেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পণ্য ও সেবা কেনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সেই সময়ই বোয়িং কেনার সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা সামনে আসে।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চিঠিতেও বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্যিক ক্রয় নয়।
বাংলাদেশের লাভ কোথায়?
নতুন বিমান বহরে যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার দীর্ঘ দূরত্বের রুটের জন্য উপযোগী। আর ৭৩৭ ম্যাক্স আঞ্চলিক ও মাঝারি দূরত্বের রুটে ব্যবহার করা যায়।
এর ফলে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে বিমানের সক্ষমতা বাড়তে পারে। নতুন উড়োজাহাজ পুরোনো বহরের তুলনায় জ্বালানি সাশ্রয়ী হওয়ায় পরিচালন ব্যয় কমানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই উড়ান ক্রয় কতটা লাভবান করবে বাংলাদেশকে?
বড় বিনিয়োগ, বড় ঝুঁকি
একটি উড়োজাহাজের দামই শেষ খরচ নয়। এর সঙ্গে রয়েছে রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি, বিমা, পাইলট ও প্রকৌশলী প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ এবং ঋণের সুদ। ফলে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রকৃত আর্থিক বোঝা আরও বড় হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিমানগুলো কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হবে।
যদি পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়া যায়, কোনো রুট প্রত্যাশিত আয় না করে কিংবা বিমান দীর্ঘ সময় মাটিতে পড়ে থাকে, তাহলে বিশাল বিনিয়োগের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত আয় পাওয়া কঠিন হবে।
এ কারণে নতুন বিমান কেনার পাশাপাশি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা, রুট পরিকল্পনা, সময়ানুবর্তিতা এবং বাণিজ্যিক দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি।
স্বচ্ছতার প্রশ্ন
এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্ন রয়েছে।
নতুন করে ঠিক কতটি বোয়িং কেনা হবে? মোট ব্যয় কত? অর্থ কোথা থেকে আসবে? ঋণ নিলে তার সুদসহ মোট দায় কত হবে? আর বিনিয়োগের টাকা কত বছরে উঠে আসবে?
কারণ ১৪টি বিমান কেনার সিদ্ধান্তের পর যদি আবার বড় আকারের ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়, তাহলে এটি শুধু বিমান বাংলাদেশের বিষয় থাকবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যাবে রাষ্ট্রীয় অর্থ, বৈদেশিক মুদ্রা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়।