চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রায় ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা নিট মুনাফা অর্জনের পথে রয়েছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি সরকারকে প্রায় ১৫৩ কোটি টাকা রাজস্ব ও ভ্যাট দেওয়ার লক্ষ্যে পৌঁছাচ্ছে। কেরুর ইতিহাসে এটিকে অন্যতম বড় আর্থিক সাফল্য হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাব্বিক হাসান ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক কার্যক্রমে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ইউনিটের সম্ভাবনা ও সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে কেরুর চিনি কারখানায় ৬০ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। তবে ডিস্টিলারি ইউনিটে ২২৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা লাভ হয়েছে। এ ছাড়া ফার্ম ইউনিটে ৫ লাখ ৪৭ হাজার, আকন্দবাড়িয়া ইউনিটে ৭ লাখ ৬২ হাজার, বায়ো ফার্টিলাইজার ইউনিটে ১ কোটি ৪৭ লাখ ৮৪ হাজার এবং ডিস্টিলারি ফার্মা ইউনিটে ৩ লাখ ৭৯ হাজার টাকা লাভ হয়েছে।
সব ইউনিটের আয়-ব্যয়ের হিসাব সমন্বয় করে কেরুর নিট মুনাফা দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা। এর আগের অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ছিল ১২৯ কোটি ৫৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। সে হিসাবে এক বছরে মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৩৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
এর আগে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি সরকারের রাজস্ব খাতে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা প্রদান করেছিল। ওই বছরও প্রতিষ্ঠানটি চিনি কারখানার প্রায় ৬২ কোটি ১৮ লাখ টাকা লোকসান সামলে সামগ্রিকভাবে রেকর্ড মুনাফা অর্জন করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কেরুর সামগ্রিক মুনাফায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে ডিস্টিলারি ইউনিট। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এ ইউনিট থেকে ২২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকার বেশি মুনাফার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে চিনি কারখানার লোকসান কমিয়ে আনা এবং অন্যান্য ইউনিটকে লাভজনক করার বিষয়েও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রাব্বিক হাসান প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায়ও কিছু পরিবর্তন এনেছেন। এর মধ্যে ক্যামেরাভিত্তিক ডিজিটাল নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু, ড্রামজাত দেশীয় মদ বোতলজাত করার উদ্যোগ এবং বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।
কেরুর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে প্রতিটি ইউনিটের সক্ষমতা অনুযায়ী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সদর দপ্তর, বিভিন্ন ইউনিটের পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
কেরুর ব্যবস্থাপনা পরিষদে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে মহাব্যবস্থাপক (ফ্যাক্টরি) সুমন কুমার সাহা, মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) আব্দুছ সাত্তার, মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) আশরাফুল আলম ভূঁইয়া, মহাব্যবস্থাপক (খামার) সুমন কুমার সাহা এবং মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আল ফারুক ওমর শরীফ গালিবসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের কয়েকজনের ভাষ্য, একটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করতে দক্ষ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বর্তমান ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।
কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দাবি, চলমান পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা আরও বাড়ানো সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বছরে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত লাভের সম্ভাবনাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়বে।
১৮০৫ সালে ভারতের কানপুরে জন ম্যাক্সওয়েলের হাত ধরে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৮৮৭ সালে রবার্ট রাসেল কেরুর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটি তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার দর্শনায় স্থানান্তরিত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়। বর্তমানে চিনি, ডিস্টিলারি, ভিনেগার ও জৈব সারসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি।
দীর্ঘদিনের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক ও লাভজনক করতে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে কেরু আরও এগিয়ে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।