শিশুকে খাওয়াতে হবে, একটু শান্ত রাখতে হবে, কিংবা অভিভাবকের হাতে কিছুটা অবসর দরকার—এমন নানা পরিস্থিতিতে এখন অনেক পরিবারের প্রথম ভরসা হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন বা ট্যাব। পর্দায় কার্টুন কিংবা ভিডিও চালিয়ে দিলেই শিশুর মনোযোগ আটকে যায়। আপাতদৃষ্টিতে এটি স্বস্তিদায়ক সমাধান মনে হলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর আড়ালে তৈরি হচ্ছে এক নীরব সংকট—শিশুদের স্ক্রিন আসক্তি।
প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে স্ক্রিন ব্যবহার পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। কিন্তু যখন শিশুর বাস্তব অভিজ্ঞতা, সামাজিক যোগাযোগ ও স্বাভাবিক খেলাধুলার জায়গা দখল করে নেয় ভার্চুয়াল জগৎ, তখন তা হয়ে ওঠে উদ্বেগের কারণ।
মনোবিজ্ঞানীরা স্ক্রিন আসক্তিকে আচরণগত আসক্তি বা Behavioral Addiction হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অর্থাৎ, এটি কোনো রাসায়নিক পদার্থের প্রতি আসক্তি নয়; বরং মোবাইল, ট্যাব, টেলিভিশন বা ভিডিও গেম ব্যবহারের প্রতি এমন নির্ভরতা, যা ধীরে ধীরে শিশুর আচরণ ও দৈনন্দিন জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
কেন শিশু দ্রুত আসক্ত হয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের জন্য নির্মিত ডিজিটাল কনটেন্টগুলো সচেতনভাবেই এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে উজ্জ্বল রং, দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্য, চটকদার অ্যানিমেশন এবং আকর্ষণীয় শব্দের মাধ্যমে তাদের মনোযোগ দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখা যায়।
এতে মস্তিষ্কে ডোপামিন নামের এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়, যা আনন্দ ও উত্তেজনার অনুভূতি তৈরি করে। ফলে শিশুরা বারবার সেই একই অভিজ্ঞতার দিকে ফিরে যেতে চায়। যেহেতু শিশুদের মস্তিষ্ক এখনও বিকাশমান, তাই বড়দের তুলনায় তারা এই উদ্দীপনায় আরও দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু আচরণগত পরিবর্তন স্ক্রিন আসক্তির ইঙ্গিত হতে পারে। যেমন—
★স্ক্রিন ছাড়া দীর্ঘ সময় থাকতে না পারা।
★মোবাইল বা ট্যাব সরিয়ে নিলে কান্না, রাগ বা চিৎকার করা।
★খেলাধুলা ও পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়া।
★অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশতে অনীহা।
★ঘুমের রুটিন বিঘ্নিত হওয়া।
★মনোযোগ কমে যাওয়া ও খিটখিটে আচরণ।
শুধু আচরণ নয়, ব্যাহত হয় বিকাশও
চিকিৎসক ও শিশুবিকাশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে দেখা দিতে পারে—
★চোখের সমস্যা ও দৃষ্টিশক্তির চাপ।
★ঘুমের ব্যাঘাত
★স্থূলতা বা শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা।
★ভাষা শেখায় বিলম্ব।
★মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা।
★সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তির হ্রাস।
★সামাজিক দক্ষতা বিকাশে বাধা।
সমাধান কোথায়
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করাই সমাধান নয়; বরং প্রয়োজন সচেতন ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।
নির্ধারণ করুন স্ক্রিন টাইম
শিশুর বয়স অনুযায়ী দৈনিক স্ক্রিন ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময়সীমা ঠিক করে দিন।
বিকল্প কার্যক্রমে যুক্ত করুন
আঁকাআঁকি, বই পড়া, পাজল, ব্লক গেম, গল্প শোনা কিংবা বাইরে খেলাধুলার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
একসঙ্গে বসে কনটেন্ট দেখুন
শিশু কী দেখছে, তা বোঝার জন্য তার সঙ্গে বসে দেখুন এবং কনটেন্ট নিয়ে আলোচনা করুন।
ঘুমের আগে স্ক্রিন এড়িয়ে চলুন
ঘুমের অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ রাখুন।
পারিবারিক সময় বাড়ান
নিয়মিত গল্প করা, একসঙ্গে খাওয়া বা হাঁটার মতো পারিবারিক অভ্যাস শিশুর মানসিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
বাস্তব অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুর শৈশবের সবচেয়ে বড় শিক্ষক কোনো স্ক্রিন নয়—বরং বাস্তব পৃথিবী। মাটি ছোঁয়া, দৌড়ানো, পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানো, বন্ধু বানানো, গল্প শোনা, প্রশ্ন করা—এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ।
তাই প্রযুক্তির এই যুগে চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিকে দূরে রাখা নয়; বরং এমন ভারসাম্য তৈরি করা, যেখানে শিশুরা প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, কিন্তু প্রযুক্তি তাদের শৈশব কেড়ে নেবে না।