বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হওয়া উচিত রপ্তানি। অথচ বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রপ্তানিকারকরাই সবচেয়ে বেশি বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। বিশেষ করে দেশের কৃষি খাতের অভূতপূর্ব উৎপাদন সাফল্য বৈশ্বিক বাজারে রূপান্তর করা যাচ্ছে না। বিশ্বব্যাপী হালাল খাদ্যের বাজার যেখানে ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে, সেখানে এক বিশাল মুসলিম রাষ্ট্র হয়েও বাংলাদেশ এই অর্থনৈতিক রেসে কার্যত অনুপস্থিত। প্রশ্ন উঠেছে, এই ব্যর্থতা কি উৎপাদনের অভাব, নাকি রাষ্ট্রীয় ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর গভীর কোনো সংকট?
বাংলাদেশের একদল তরুণ উদ্যোক্তা বিপুল উৎসাহ নিয়ে এক্সপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (ERC) তৈরি করলেও বাস্তবতার মাটিতে এসে তারা হারিয়ে যাচ্ছেন। একজন উদ্যোক্তা যদি দেশের বাইরে কৃষি পণ্য বা প্রক্রিয়াজাত মাংস রপ্তানি করতে চান, তবে তাকে এক দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং কোয়ারেন্টাইন বিভাগসহ প্রায় ১৫ থেকে ২০টি টেবিল ঘুরে সনদ সংগ্রহ করতে হয়।
অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় "Transaction Cost" বা লেনদেন ব্যয়। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ দেখিয়েছিলেন, উন্নত ও অনুন্নত দেশের মূল পার্থক্য গড়ে দেয় এই লেনদেন ব্যয়। যে দেশে ব্যবসা শুরু করতে কম সময় লাগে, আমলাতান্ত্রিক অনিশ্চয়তা কম থাকে, সেখানেই বিনিয়োগ ও উদ্ভাবন বাড়ে। বাংলাদেশে এই ব্যয় আকাশচুম্বী হওয়ায় নতুন উদ্যোক্তারা শুরুতেই ঝরে পড়ছেন।
একটি কৃষিনির্ভর অর্থনীতি কীভাবে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হবে—তা যেকোনো দেশের টেকসই উন্নয়নের মৌলিক প্রশ্ন। ১৯৫৪ সালে অর্থনীতিবিদ আর্থার লুইস তার বিখ্যাত 'ডুয়াল ইকোনমি মডেল'-এ দেখিয়েছিলেন, কৃষি খাতের উদ্বৃত্ত শ্রমকে শিল্প খাতে স্থানান্তর করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই উন্নয়নের মূল গতিপথ। বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান ৬০ শতাংশ থেকে কমে ১১ শতাংশে নামলেও কর্মসংস্থানের বড় অংশ এখনো কৃষিতেই আটকে আছে। অর্থাৎ, মানুষ কৃষি থেকে বের হলেও উচ্চ উৎপাদনশীল শিল্পে প্রবেশ করতে পারেনি।
এর ফলে তৈরি হয়েছে এক বৈপরীত্য, যাকে বলা যায় "Low Value Trap" বা নিম্নমূল্যের ফাঁদ। বাংলাদেশ প্রতি বছর লাখ লাখ টন আলু উৎপাদন করলেও ফুড প্রসেসিং বা প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাবে তা নষ্ট হচ্ছে। কাঁচা চামড়া সস্তায় রপ্তানি হলেও উচ্চমূল্যের চামড়াজাত পণ্য আমাদের চড়া দামে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। কৃষি পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধিতে এই শিল্পায়নের অভাব বড় বাধা।
| খাত | বৈশ্বিক বাজারের আকার | বাংলাদেশের রপ্তানি আয় | প্রধান প্রতিবন্ধকতা |
| হালাল খাদ্য ও মাংস | ২.০+ ট্রিলিয়ন ডলার | ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে | দ্বৈত সার্টিফিকেশন (BSTI ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন) |
| কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য | ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার | ৮৫০-৯৮0 মিলিয়ন ডলার | কোল্ড চেইনের অভাব ও ল্যাব টেস্টিং জটিলতা |
বাংলাদেশের কৃষি বাজারে হিমাগার মালিক, আমদানিকারক, পাইকারি ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন লাইসেন্সনির্ভর গোষ্ঠী একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্লক গড়ে তুলেছে। যদি কৃষি পণ্য রপ্তানি সহজ হয়ে যায়, তবে দেশের প্রান্তিক কৃষক সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের একচেটিয়া মুনাফা কমে যাবে। ফলস্বরূপ, বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক কাঠামোকে জটিল রাখার পেছনে এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রচ্ছন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ কাজ করে। কৃষক কম দাম পায়, ভোক্তা চড়া মূল্য দেয়, আর মাঝখানের সিন্ডিকেট বিপুল অর্থ লুটে নেয়।
অর্থনীতিবিদ মানসুর ওলসনের 'কালেক্টিভ অ্যাকশন থিওরি' ব্যাখ্যা করে, কেন একটি ক্ষুদ্র কিন্তু সুসংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠী প্রায়ই দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে জিম্মি করতে পারে। ঠিক এই কারণেই রপ্তানি প্রক্রিয়ায় বছরের পর বছর কোনো প্রশাসনিক সংস্কার হয় না, অথচ আমদানির ক্ষেত্রে দ্রুত গতি দেখা যায়।
আমাদের প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর আরেকটি বড় ব্যর্থতা হলো—যে উদ্যোক্তা বৈধ উপায়ে দেশে ডলার আনতে চান, তাকে ফাইলের পেছনে মাসের পর মাস দৌড়াতে হয়। অন্যদিকে অর্থপাচার, হুন্ডি, ওভার-ইনভয়েসিং কিংবা আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মতো অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বছরের পর বছর ধরে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
রাষ্ট্রের নীতি ও আমলাতান্ত্রিক কৌশল যদি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বৈধ ব্যবসার চেয়ে অবৈধ পথকে তুলনামূলক সহজ করে তোলে, তবে অর্থনীতি ধীরে ধীরে উৎপাদনশীল খাত থেকে রেন্ট-সিকিং (বিনা পরিশ্রমে অর্থ উপার্জন) খাতে রূপ নেয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল নতুন পোশাক কারখানায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, দুগ্ধশিল্প এবং কৃষি পণ্য রপ্তানি খাতের বিকাশ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব। রাষ্ট্র যদি উদ্যোক্তাদের পথ সহজ না করে, তবে সম্ভাবনার পাহাড় নিয়েও বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারে একটি সীমিত অর্থনীতি হিসেবেই থমকে থাকবে।